← প্রকাশনা ২০৭৫: আমরা যা হতে পারি
প্রথম ম্যানুস্ক্রিপ্ট ড্রাফট

২০৭৫: আমরা যা হতে পারি

বাংলাদেশের ভবিষ্যতের একটি নকশা

এ.এন.এম. নুরুদ্দিন

CARO বাংলা · ২০২৬

২০৭৫

ভূমিকা — কেন এই বই

এই বইটা কোনো একজন মানুষের গল্প নয়। এই বইটা আপনার গল্প — আর একই সাথে, এই দেশের আঠারো কোটি মানুষের গল্প, যারা প্রতিদিন সকালে চা খেতে খেতে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হন, যদিও অনেকে সেই প্রশ্নটা কখনো শব্দ করে বলেননি।

প্রশ্নটা এই — আমাদের এত মানুষ, এত মেধা, এত তরুণ শক্তি, তারপরও আমরা কিছু তৈরি করতে পারি না কেন? আমরা কেন প্রতি পাঁচ বছরে, দশ বছরে, একই লড়াইয়ে ফিরে যাই, একই নাম, একই ক্ষত, একই অভিযোগ নিয়ে? আমরা কেন এমন একটা দেশ, যেখানে প্রতিভা আছে প্রচুর, কিন্তু সেই প্রতিভা ফলবান হয় দেশের বাইরে গিয়ে, দেশের ভেতরে না?

এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়। প্রতিটা প্রজন্ম এগুলো নিজের ভাষায় জিজ্ঞেস করেছে। কিন্তু প্রতিটা প্রজন্ম একই উত্তরে থেমে গেছে — "রাজনীতি খারাপ," "নেতারা স্বার্থপর," "এই দেশে কিছু হবে না।" এই উত্তরগুলো ভুল না, কিন্তু এগুলো অসম্পূর্ণ। এগুলো একটা লক্ষণ ধরে, রোগটা ধরে না।

এই বইটা রোগটা ধরার চেষ্টা। আর এটা ধরার পর, একটা প্রশ্নে পৌঁছানোর চেষ্টা যা আমরা প্রায় জিজ্ঞেস করিই না — যদি সমস্যাটা কোনো মানুষের চরিত্রে না হয়ে একটা কাঠামোয় থাকে, তাহলে সেই কাঠামো বদলানো কি সম্ভব? বিপ্লব ছাড়া, রক্তপাত ছাড়া, ধ্বংস ছাড়া — শুধু ধীর, ইচ্ছাকৃত, প্রজন্মব্যাপী নকশা দিয়ে?

আমার বিশ্বাস, হ্যাঁ। এই বইটা সেই বিশ্বাসের একটা মানচিত্র।

আপনি এই বইটা পড়তে গিয়ে কিছু অংশে কষ্ট পাবেন। কিছু অংশে রাগ হবে। কিছু অংশে আপনার মনে হবে, এটা তো আমার নিজের জীবনের কথা বলছে। এটা ইচ্ছাকৃত। কারণ এই বইটা কোনো নীতিমালা নয়, কোনো গবেষণাপত্র নয় — এটা একটা যাত্রা, যার মধ্য দিয়ে আমরা একসাথে যাব, প্রথমে যা হারিয়েছি তার শোক করে, তারপর যা চুরি হয়েছে তার জন্য ক্ষুব্ধ হয়ে, তারপর সেই ক্ষোভটাকে একটা দিক দিয়ে, আর শেষে একটা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে যা আমরা এখনও তৈরি করতে পারি।

এই বইয়ে কোনো দলের নাম আসবে না, কোনো নেতার নাম আসবে না। এটা ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত, কারণ যে সমস্যাটা এই বই ধরতে চায়, তা কোনো একটা নাম বদলে গেলে শেষ হয় না — এটা একটা কাঠামোর সমস্যা, আর কাঠামো সব নামের ঊর্ধ্বে টিকে থাকে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। যদি আপনি এই বইয়ে আপনার পছন্দের বা অপছন্দের কোনো পক্ষের ছায়া খুঁজতে যান, আপনি এই বইয়ের আসল কথাটা মিস করবেন।

এই বইয়ের নাম ২০৭৫, কিন্তু এটা কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়। কেউ জানে না ২০৭৫ সালে বাংলাদেশ কেমন হবে। এই বইটা একটা প্রশ্ন তোলে তার বদলে — যদি আমরা ইচ্ছা করি, তাহলে ২০৭৫ কেমন হতে পারে? এই "পারে" শব্দটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ এই বইয়ে। এটা প্রতিশ্রুতি নয়। এটা সম্ভাবনা — আর সম্ভাবনা তখনই বাস্তব হয়, যখন যথেষ্ট মানুষ তার জন্য কাজ করতে রাজি হয়।

তাই এই বইটা শেষ পর্যন্ত একটা আমন্ত্রণ। আমন্ত্রণ শোক করার জন্য যা হারিয়েছি। আমন্ত্রণ ক্ষুব্ধ হওয়ার জন্য, ঠিক জায়গায়। আমন্ত্রণ স্বপ্ন দেখার জন্য, নির্দিষ্টভাবে, বিস্তারিতভাবে, যেন এটা সত্যিই সম্ভব — কারণ এটা সম্ভব। আর সবচেয়ে বেশি, আমন্ত্রণ একটা প্রতিশ্রুতি করার জন্য, নিজের কাছে, যে সোমবার সকাল থেকে কিছু একটা বদলাবে — ছোট, কিন্তু আসল।

চলুন শুরু করি, একটা সকাল থেকে।

Movement ১ — Recognition

প্রথম অধ্যায়: আয়না

১. একটা সকাল

কল্পনা করুন একটা সকাল।

চা এখনও গরম, ফোনটা হাতে, চোখ এখনও ঘুম থেকে পুরোপুরি সরেনি। আপনি খবরের অ্যাপটা খুলছেন, যেমন প্রতিদিন খোলেন। আর সেখানে যা দেখছেন, তা হলো — একটা ল্যাবের খবর। ঢাকায় তৈরি। এমন একটা আবিষ্কার, যার ফলাফল এখন সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা পড়ছেন, উদ্ধৃত করছেন, নিজেদের গবেষণায় ব্যবহার করছেন। কমেন্টে কেউ লিখছে না কে ভালো কে খারাপ। কেউ লিখছে না পঞ্চাশ বছর আগে কী হয়েছিল। মানুষ লিখছে — এটা আমরা তৈরি করেছি।

থামুন একটু। এই কল্পনাটা করতে আপনার কষ্ট হলো, তাই না?

সেটাই এই বইয়ের প্রথম সত্য। আমাদের সকাল অন্য কিছু দিয়ে তৈরি। আমাদের সকাল তৈরি হয় পুরনো একটা মামলার নতুন রায় দিয়ে। কারো একটা পুরনো বিবৃতির নতুন সংস্করণ দিয়ে। কারো একটা পুরনো ক্ষতে নতুন খোঁচা দিয়ে। খবরের অ্যাপ খুললেই আমরা জানি কী পাবো — কে কাকে দোষ দিচ্ছে, কে কার বিরুদ্ধে কথা বলছে, কোন পুরনো লড়াই আজ আবার নতুন মুখোশ পরে ফিরে এসেছে।

আমরা এটাতেই বড় হয়েছি। পঞ্চাশ বছর ধরে। একই তিন-চারটা নাম, একই তিন-চারটা পক্ষ, একই তিন-চারটা গল্প — শুধু চরিত্রগুলো বদলায়, গল্পটা বদলায় না। আমরা শিখেছি কার পক্ষে থাকতে হবে, কার বিরুদ্ধে থাকতে হবে। আমরা শিখিনি কী তৈরি করতে হবে।

এটা কারো দোষ দেওয়ার কথা নয় — এখনও নয়। এটা শুধু একটা পর্যবেক্ষণ, এত সহজ যে আমরা প্রায় এটা দেখতেই ভুলে গেছি: আমাদের জাতীয় মনোযোগ একটা সীমিত সম্পদ, এবং সেই সম্পদ সম্পূর্ণভাবে বরাদ্দ হয়ে গেছে অতীতের হাতে।

যা মনোযোগ দিয়ে তৈরি হতে পারতো একটা ল্যাব, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ, একটা কোম্পানি যা বিশ্বকে কিছু বিক্রি করে — তা প্রতিদিন খরচ হয়ে যায় একটা পুরনো লড়াইয়ের হিসাব রাখতে।

এই বইটা সেই বরাদ্দ নিয়ে একটা প্রশ্ন তোলে।

যদি আমরা এই মনোযোগটা অন্য কোথাও দিতাম?

২. আমরা যা দেখতে অভ্যস্ত

এখন একটু সৎ থাকা যাক নিজেদের সাথে।

আপনি যখন সকালে চা খেতে খেতে খবর পড়েন, আপনার মাথায় কী চলে? বেশিরভাগ দিন, উত্তরটা হলো — কারো একটা কথায় আপনি বিরক্ত হন। কারো একটা কাজে আপনি ক্ষুব্ধ হন। কেউ একজন কিছু বলেছে যা আপনার পক্ষের বিরুদ্ধে, বা আপনার বিরুদ্ধ পক্ষের হয়ে। আপনি একটা মন্তব্য লেখেন, বা লিখতে গিয়ে থেমে যান, কারণ জানেন এটা কোনো কাজে আসবে না।

এবং তারপর আপনি কাজে যান। জীবনযাপন করেন। কিন্তু ওই দশ মিনিট, ওই ক্ষোভ, ওই হতাশা — সেটা কোথাও যায় না। সেটা জমা হয়। প্রতিদিন একটু একটু করে।

এখন হিসাব করুন। যদি একজন মানুষ দিনে দশ মিনিট এই ভাবে "খরচ" করে — শুধু রাগ করে, হতাশ হয়ে, কিছুই বদলাতে না পেরে — তাহলে সারা দেশে, প্রতিদিন, কত কোটি মিনিট এভাবে হারিয়ে যায়? এক বছরে? পঞ্চাশ বছরে?

এটা কোনো ছোট সংখ্যা নয়। এটা একটা জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ — তার মনোযোগ, তার শক্তি, তার তরুণদের সময় — সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার হিসাব।

আমরা এটাকে "রাজনীতি" বলি। কিন্তু আসলে এটা রাজনীতি না — এটা একটা এমন ব্যবস্থা, যা শিখিয়ে দিয়েছে আমাদের কী নিয়ে ভাবতে হবে, আর কী নিয়ে ভাবা "বিলাসিতা"। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা, স্বপ্ন দেখা, কিছু তৈরি করার কথা ভাবা — এসব যেন এক ধরনের অপরাধ, যখন দেশে "এত বড় বড়" সমস্যা আছে।

কিন্তু প্রশ্নটা হলো — এই "বড় বড় সমস্যা"গুলো কি আসলেই আমাদের সমস্যা? নাকি এগুলো এমন কিছু মানুষের সমস্যা, যাদের ঝগড়া আমরা পঞ্চাশ বছর ধরে নিজেদের ঝগড়া বলে মেনে নিয়েছি?

এই বইয়ের পরের অধ্যায়গুলোতে আমরা এই প্রশ্নটার গভীরে যাবো। কিন্তু এখানে, এই প্রথম অধ্যায়ে, শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট: আমরা যা দেখতে অভ্যস্ত, তা-ই বাস্তবতা নয়। এটা একটা অভ্যাস — এবং অভ্যাস বদলানো যায়।

৩. এই বইটা কার জন্য

এই বইটা কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে লেখা নয়। এটা কোনো নেতার বিরুদ্ধে, কোনো পরিবারের বিরুদ্ধে, কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বিরুদ্ধে লেখা নয়। যদি আপনি এই বইটা পড়ে ভাবেন "আহা, এটা তো ওই দলটার কথা বলছে" — তাহলে থামুন, আর একবার পড়ুন। কারণ যদি সেটাই মনে হয়, তাহলে এই বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা আপনি এখনও ধরতে পারেননি।

এই বইটা একটা কাঠামোর কথা বলছে। এমন একটা কাঠামো, যা যে কোনো নাম, যে কোনো দল, যে কোনো প্রজন্মের হাতে একই ফল দেয় — একই ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, একই ধরনের জবাবদিহিতার অভাব, একই ধরনের অতীত-নির্ভর রাজনীতি। মানুষগুলো বদলায়। কাঠামো বদলায় না।

এই বইটা তাদের জন্য, যারা ক্লান্ত। ক্লান্ত রাগ করতে করতে, ক্লান্ত হতাশ হতে হতে, ক্লান্ত এই অনুভূতিতে যে কিছুই বদলাচ্ছে না।

এই বইটা তাদের জন্য, যাদের বয়স এখন বিশ বা ত্রিশ, যারা এখনও জানেন না তাদের সামনে কতটা সময় আছে, আর কতটা মনোযোগ তারা ইতিমধ্যে হারিয়ে ফেলেছেন এমন লড়াইয়ে, যা তাদের নিজের লড়াই ছিলই না।

এই বইটা তাদের জন্য, যারা কখনো ভেবেছেন — আমাদের এত মানুষ, এত মেধা, এত শক্তি, তাও আমরা কিছু তৈরি করতে পারি না কেন? এই প্রশ্নটা যদি আপনার মাথায় কখনো এসেছে, তাহলে আপনি এই বইয়ের পাঠক।

সামনের অধ্যায়গুলোতে আমরা কাঁদবো — কারণ যা হারিয়েছি, তার জন্য শোক করা প্রয়োজন। আমরা রাগ করবো — কারণ এই ক্ষতি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা একটা চুরি। আর তারপর, সেই রাগ থেকে, আমরা একটা প্রশ্নে পৌঁছাবো যা এই বইয়ের আসল কেন্দ্র: যদি আমরা ভেঙে ফেলার বদলে, নতুন করে নকশা করি?

কিন্তু সেটার আগে, আমাদের একটা সৎ হিসাব করতে হবে — আমরা কী হারিয়েছি, ঠিক কী পরিমাণে।

সেই হিসাবই পরের অধ্যায়ে।

Movement ২ — Grief

দ্বিতীয় অধ্যায়: শোক

৪. যে ল্যাব কখনো তৈরি হয়নি

একজন মানুষের কথা কল্পনা করুন।

তার জন্ম হয়েছিল চট্টগ্রামের কোনো এক মহল্লায়, বা রাজশাহীর কোনো গ্রামে, বা খুলনার কোনো টিনের ঘরে। ছোটবেলায় তার হাতে একটা ভাঙা রেডিও ছিল, আর সেই রেডিওটা খুলে সে দেখতে চাইত ভেতরে কী আছে। স্কুলে সে অঙ্কে সবচেয়ে ভালো ছিল। শিক্ষক বলতেন, এই ছেলেটা একদিন কিছু একটা হবে।

সে বড় হলো। তার মধ্যে সেই কৌতূহলটা রইল। কিন্তু তার সামনে যে পথ ছিল, সেটা গবেষণার দিকে যায়নি — কারণ গবেষণার জন্য কোনো তহবিল ছিল না, কোনো ল্যাব ছিল না, কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না যা তাকে বলতে পারতো, তুমি এখানে থেকে বিশ্বমানের কিছু তৈরি করতে পারবে। তার পথ গেল বিদেশে, অথবা একটা ব্যাংকের চাকরিতে, অথবা কোনো এনজিওতে, অথবা কোথাও না — শুধু টিকে থাকার লড়াইয়ে।

এই মানুষটা একজন নয়। এই মানুষটা লক্ষ লক্ষ।

এটাই এই অধ্যায়ের প্রথম কথা, এবং এটা বলা কঠিন, কারণ এতে কোনো রাগ নেই, কোনো অভিযোগ নেই — শুধু একটা শোক। আমরা জানি না আমরা কী হারিয়েছি, কারণ যা হারানো হয়েছে তা কখনো তৈরিই হয়নি। একটা যুদ্ধে হারানো জিনিসের একটা তালিকা করা যায় — কতজন মানুষ, কতগুলো ঘর, কতগুলো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যা কখনো অস্তিত্বে আসেনি, তার কোনো তালিকা হয় না। কোনো স্মৃতিস্তম্ভ হয় না। কোনো শোকদিবস হয় না।

বাংলাদেশে এমন কোনো ল্যাব নেই যার নাম বিশ্বের কোনো বিজ্ঞানী শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করে। এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ নেই যেখানে বিদেশ থেকে ছাত্র আসে পড়তে, কারণ সেখানে সেরা কাজ হয়। এমন কোনো প্রযুক্তি কোম্পানি নেই যা পৃথিবীকে কিছু বিক্রি করে যা শুধু বাংলাদেশই তৈরি করতে পারে। এটা বলা কোনো অপমান নয় — এটা একটা সাদা কাগজে লেখা সত্যি, আর সাদা কাগজে লেখা সত্যি সবচেয়ে বেশি ব্যথা দেয়, কারণ তার বিরুদ্ধে তর্ক করার কিছু নেই।

এবং এটা মেধার অভাবে হয়নি। এটা এখানেই সবচেয়ে বেশি কষ্টের জায়গা। এই দেশের মানুষ পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা ফল করে — যখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়টা এই দেশের বাইরে থাকে। এই দেশের মানুষ পৃথিবীর সেরা কোম্পানিতে সেরা কাজ করে — যখন সেই কোম্পানিটা এই দেশের বাইরে থাকে। মেধা এখানে আছে। শুধু এই মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই মেধা কিছু তৈরি করতে পারেনি।

কেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পরের অধ্যায়গুলোতে খুঁজব। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, শুধু থামুন আর অনুভব করুন এই ক্ষতিটা। এটা কোনো বিমূর্ত পরিসংখ্যান নয়। এটা একজন মানুষের কথা যিনি কখনো জানতেই পারলেন না তিনি কী হতে পারতেন।

৫. পঞ্চাশ বছরের হিসাব

চলুন একটা হিসাব করি, যদিও এই হিসাবটা করতে কষ্ট হবে।

১৯৭১ সালে যখন এই দেশ স্বাধীন হলো, তখন এমন অনেক দেশ ছিল যারা আমাদের সাথে প্রায় একই জায়গা থেকে শুরু করেছিল — দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া। আজ সেই দেশগুলোর নাম বিশ্বের প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, শিল্পের মানচিত্রে আছে। সিঙ্গাপুরের একটা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের শীর্ষ তালিকায় থাকে। দক্ষিণ কোরিয়ার একটা কোম্পানির ফোন আপনার হাতে আছে, এই বইটা পড়ার সময়ও হয়তো।

আমরা কোথায়?

এটা বলার মানে এই নয় যে ওই দেশগুলোর ইতিহাস সহজ ছিল, বা তাদের কোনো সংকট ছিল না। ছিল। কিন্তু একটা জায়গায় তারা আলাদা হয়ে গেল আমাদের থেকে — তারা একটা সময়ের পর তাদের জাতীয় মনোযোগ ঘুরিয়ে দিলো অতীতের হিসাব থেকে ভবিষ্যতের নকশার দিকে। আমরা পারিনি। আমরা পঞ্চাশ বছর ধরে একই প্রশ্নের চারপাশে ঘুরপাক খেয়েছি — কে সঠিক ছিল, কে ভুল ছিল, কার সাথে কী হয়েছিল ১৯৭৫ সালে, ১৯৯০ সালে, ২০০৬ সালে, ২০১৪ সালে, ২০২৪ সালে।

প্রতিটা প্রজন্ম ভেবেছে, এই লড়াইটা শেষ হলে, তারপর আমরা এগিয়ে যাব। কিন্তু লড়াই কখনো শেষ হয় না, কারণ লড়াইটাই ব্যবস্থা হয়ে গেছে — লড়াই শেষ হওয়ার কথা নয়, লড়াই চলতে থাকার কথা, কারণ এটাই কাঠামোটাকে টিকিয়ে রাখে। এই কথাটা আমরা পরে আরও গভীরভাবে বুঝব। এখন শুধু এই ক্ষতির পরিমাণ অনুভব করুন।

পঞ্চাশ বছর মানে দুই প্রজন্মেরও বেশি সময়। পঞ্চাশ বছর মানে এমন মানুষ, যারা জন্ম নিয়েছে, বড় হয়েছে, বৃদ্ধ হয়েছে, মরে গেছে — এই একই লড়াই দেখতে দেখতে। তাদের নাতি-নাতনিরাও একই লড়াই দেখছে, শুধু নতুন হ্যাশট্যাগে।

এটা কোনো জাতির ভাগ্য নয়। এটা একটা নকশার ফলাফল — এমন একটা নকশা, যা কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করেনি, কিন্তু যা এখন নিজে থেকেই চলছে, নিজেকে টিকিয়ে রাখছে, প্রতিটা প্রজন্মকে একই ফাঁদে ফেলছে।

৬. প্রতিবেশীর উঠান

একটা কঠিন সত্য বলা প্রয়োজন, যদিও এটা বলতে ভালো লাগে না।

একটা দেশ যখন নিজের দিক ঠিক করে না, তখন অন্য কেউ সেই দিকটা ঠিক করে দেয়। এটা কোনো ষড়যন্ত্র নয় — এটা একটা শূন্যস্থানের নিয়ম। ভারত আর পাকিস্তান, দুটো বড় প্রতিবেশী, প্রত্যেকে তাদের নিজের ইতিহাস, নিজের রাজনীতি, নিজের স্বার্থ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। আর বাংলাদেশ, বহু ক্ষেত্রে, হয়ে উঠেছে তাদের হিসাবের একটা ঘর — একটা এমন জায়গা, যেখানে তাদের প্রভাব, তাদের প্রতিযোগিতা, তাদের স্বার্থ খেলা হয়।

এটা বলার মানে এই নয় যে বাংলাদেশ অসহায়। এটা বলার মানে এই যে, যখন একটা দেশ নিজের ভবিষ্যতের একটা নকশা তৈরি করে না, তখন সেই দেশ অন্য কারো নকশার একটা অংশ হয়ে যায়। এটা কোনো বাহ্যিক শক্তির দোষ নয় — এটা আমাদের নিজের অমনোযোগের ফল।

ভাবুন — যদি আমাদের একটা এমন প্রতিষ্ঠান থাকত, যার গবেষণা বিশ্ব মানত। যদি আমাদের একটা এমন অর্থনীতি থাকত, যা কাউকে সস্তা শ্রম বিক্রি করে না, বরং এমন কিছু বিক্রি করে যা কেউ আর কোথাও পায় না। তাহলে আমরা কারো "উঠান" থাকতাম না। আমরা নিজেরাই একটা উঠান হতাম, যেখানে অন্যরা আসতে চাইতো।

এই সম্ভাবনাটা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন আমরা বুঝব — এই অবস্থার জন্য কোনো একজন মানুষ বা একটা দল দায়ী নয়। এটা একটা ব্যবস্থার ফল, যে ব্যবস্থা আমাদের মনোযোগকে বছরের পর বছর ভুল জায়গায় বেঁধে রেখেছে।

এখন প্রশ্ন হলো — কে বা কী এই মনোযোগটা চুরি করেছে? পরের অধ্যায়ে আমরা সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হব। এবং সাবধান — সেখানে যা দেখব, তা আমাদের রাগিয়ে দেবে।

Movement ৩ — Rage

তৃতীয় অধ্যায়: রাগ

৭. তিন-চারটা পরিবার

এখন সময় হয়েছে সরাসরি কথা বলার।

পঞ্চাশ বছর ধরে, এই দেশের রাজনীতি ঘুরেছে হাতে গোনা কয়েকটা নাম, কয়েকটা পরিবার, কয়েকটা বংশের চারপাশে। এটা বলার জন্য কোনো নির্দিষ্ট নাম উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই — আপনি নিজেই জানেন কাদের কথা বলা হচ্ছে, কারণ আপনি নিজের পুরো জীবন ধরে তাদের নাম শুনেছেন। প্রশ্নটা এখানে নাম নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হলো — কেন একই কাঠামো, একই ধরনের আনুগত্য, একই ধরনের বংশানুক্রম, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকে?

উত্তরটা রাজনৈতিক নয়। উত্তরটা মানুষের মনস্তত্বের সবচেয়ে পুরনো একটা নিয়মে লুকানো — মানুষ একটা পরিচয় খোঁজে, একটা পক্ষ খোঁজে, একটা এমন জায়গা যেখানে তার আনুগত্য কাউকে দেখানোর সুযোগ পায়। যখন একটা রাষ্ট্র তার নাগরিকদের এই আনুগত্যটা দেওয়ার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা তৈরি করে না — যখন সেখানে কোনো শক্তিশালী স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নেই, কোনো এমন ব্যবস্থা নেই যেখানে যোগ্যতা পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় — তখন মানুষ তার আনুগত্যটা দিয়ে দেয় সবচেয়ে সহজলভ্য জায়গায়: একটা পরিবার, একটা নাম, একটা বংশ।

এটা একটা কাল্ট নয় ধর্মীয় অর্থে। কিন্তু এটা কাল্টের মতোই কাজ করে — একই ধরনের অন্ধ আনুগত্য, একই ধরনের প্রশ্নহীনতা, একই ধরনের "আমাদের বনাম ওদের" মানসিকতা। পার্থক্য এই যে, এখানে দেবতার জায়গায় আছে একটা নাম, আর ধর্মগ্রন্থের জায়গায় আছে একটা ইতিহাসের বয়ান — যে বয়ানটা প্রতিটা পক্ষ নিজের মতো করে বলে, আর প্রতিটা প্রজন্মকে শেখায় সেই বয়ানটা আঁকড়ে ধরে বড় হতে।

এবং এখানেই সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিসটা ঘটে — এই আনুগত্যের কাঠামোটা এমনভাবে তৈরি হয়ে গেছে যে, এটা টিকে থাকার জন্য একজন মানুষের মৃত্যুর অপেক্ষা করে না। একটা পরিবার শেষ হলে, একটা নতুন পরিবার সেই জায়গা নেয়। একটা বংশ দুর্বল হলে, আনুগত্যটা আরেকটা বংশের দিকে সরে যায়। কাঠামোটা মানুষের চেয়ে বেশি দিন টেকে, কারণ কাঠামোটাই আসল জিনিস — মানুষগুলো শুধু তার বর্তমান মুখ।

এটা বোঝা দরকার, কারণ এটা না বুঝলে, আপনি ভাববেন এই একটা পরিবার, এই একটা নাম বদলে গেলেই দেশ বদলে যাবে। কিন্তু কাঠামো যদি একই থাকে, তাহলে নতুন নাম শুধু পুরনো জায়গায় বসবে। আমরা এটা পরের অধ্যায়ে গভীরভাবে দেখব। এখন শুধু এই সত্যটা মাথায় রাখুন: আপনি যাদের ঘৃণা করেন বা পূজা করেন, তারা সমস্যা নয়। তারা একটা সমস্যার লক্ষণ।

৮. মনোযোগ কীভাবে চুরি হয়

এখন আসল প্রশ্নে আসা যাক — এই কাঠামোটা কীভাবে টিকে থাকে? উত্তর একটাই শব্দে: মনোযোগ।

একটা রাজনৈতিক কাঠামো যদি টিকে থাকতে চায়, তার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো নাগরিকের ফাঁকা সময়, ফাঁকা মন — এমন একটা মুহূর্ত যখন কেউ থেমে ভাবে, "আমি আসলে কী চাই আমার জীবনে, আমার দেশে?" কারণ সেই প্রশ্নটা থেকেই নতুন কিছু তৈরি হয় — নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নতুন দাবি, নতুন প্রশ্ন যা পুরনো কাঠামোর জন্য বিপজ্জনক।

তাই কাঠামোটা, ইচ্ছাকৃতভাবে নয়, কিন্তু কার্যকরভাবে, নিশ্চিত করে যে এই ফাঁকা মুহূর্তটা কখনো আসে না। প্রতিদিন একটা নতুন ঘটনা, একটা নতুন বিতর্ক, একটা নতুন অভিযোগ, একটা পুরনো ক্ষতের নতুন খোঁচা — এসব মিলিয়ে জাতীয় মনোযোগ সবসময় ব্যস্ত থাকে। এবং এই ব্যস্ততাটা এমনভাবে ডিজাইন করা, যাতে এটা কখনো শেষ না হয় — কারণ প্রতিটা ঘটনার জবাব দিতে আরেকটা ঘটনা লাগে, আর সেই জবাবের জবাব দিতে আরেকটা।

এটা এক ধরনের অর্থনীতি — ক্ষোভের অর্থনীতি। এই অর্থনীতিতে মুদ্রা হলো আপনার মনোযোগ, আর সেই মুদ্রা প্রতিদিন খরচ হয়ে যায় এমন লড়াইয়ে, যার ফলাফলে আপনার জীবন প্রকৃতপক্ষে বদলায় না — শুধু বদলায় কে ক্ষমতায় আছে, কোন নাম আজ শিরোনামে।

আর এই অর্থনীতির সবচেয়ে দুঃখজনক অংশ হলো — আপনি স্বেচ্ছায় অংশ নিচ্ছেন, কারণ এটা আপনার কাছে "রাজনীতি সচেতন থাকা" বলে মনে হয়। আপনি ভাবছেন আপনি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন — পক্ষ নেওয়া, তর্ক করা, প্রতিক্রিয়া দেওয়া। কিন্তু আসলে আপনি একটা মেশিনের জ্বালানি হয়ে যাচ্ছেন, এমন একটা মেশিনের যা কখনো আপনার জন্য কিছু তৈরি করে না — শুধু নিজেকে চালিয়ে রাখে।

এই কথাটা শুনতে কষ্ট হবে। শোনা উচিতও। কারণ এখান থেকেই রাগ শুরু হওয়ার কথা — কিন্তু ঠিক জায়গায়।

৯. যাকে আমরা রাজনীতি বলি

আমরা যাকে "রাজনীতি" বলি, তার আসলে দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ থাকতে পারে।

একটা অর্থ হলো — কীভাবে একটা সমাজ তার সম্পদ ভাগ করবে, তার ভবিষ্যৎ ঠিক করবে, তার প্রতিষ্ঠান গড়বে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া। এই অর্থে রাজনীতি একটা প্রয়োজনীয়, গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি সুন্দর জিনিস — এটা এমন একটা যন্ত্র, যার মাধ্যমে একটা জাতি তার নিজের ভবিষ্যৎ ডিজাইন করে।

কিন্তু আমরা যাকে দিনে দিনে "রাজনীতি" বলে চিনি, তা প্রায় সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। এটা এমন একটা থিয়েটার, যেখানে মূল বিষয়বস্তু হলো পরিচয়, আনুগত্য, আর অতীত — আর ভবিষ্যৎ, নীতি, নির্মাণ — এসব প্রায় অনুপস্থিত। আমরা তর্ক করি কে সঠিক ছিল ১৯৭৫-এ, কে দায়ী ২০০৬-এ, কে ষড়যন্ত্র করেছিল ২০১৪-তে। আমরা তর্ক করি না — আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত ২০৪০-এ, আমাদের অর্থনীতি কী রপ্তানি করা উচিত ২০৫০-এ, আমাদের শহরগুলো কেমন দেখতে হওয়া উচিত ২০৬০-এ।

এই দ্বিতীয় ধরনের রাজনীতি — প্রথম ধরনের ছদ্মবেশে — এতটাই আমাদের জাতীয় জীবনে গেঁথে গেছে যে আমরা আর পার্থক্যটা বুঝতেই পারি না। আমরা ভাবি এটাই রাজনীতি, এটাই স্বাভাবিক, এটাই বিশ্বের নিয়ম। কিন্তু এটা স্বাভাবিক নয়। এমন অনেক দেশ আছে যেখানে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে থাকে কর ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, জলবায়ু, প্রযুক্তি — অতীতের হিসাব নয়।

আর এখানেই আসল রাগের জায়গা। আমাদের বলা হয়েছে এটাই রাজনীতি, যখন আসলে আমাদের কাছ থেকে রাজনীতিটাই কেড়ে নেওয়া হয়েছে — সত্যিকারের রাজনীতি, যে রাজনীতি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে, তার জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে একটা অতীত-নাটক, যা আমাদের ব্যস্ত রাখে কিন্তু কিছুই তৈরি করে না।

১০. চোরটা কে

তাহলে প্রশ্নটা এবার সরাসরি করা যাক — চোরটা কে?

উত্তরটা আপনাকে হতাশ করতে পারে, কারণ আপনি একটা মুখ খুঁজছেন, একটা নাম, যাকে দোষ দিয়ে আপনি শান্তি পাবেন। কিন্তু সত্যিটা হলো — এখানে কোনো একজন চোর নেই। এখানে আছে একটা কাঠামো, যা চুরি করার জন্য তৈরিই হয়ে গেছে, কারো ইচ্ছাকৃত নকশা ছাড়াই।

এটা এমন একটা ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতা টিকে থাকে বিভাজন থেকে, ঐক্য থেকে নয়। যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকে, কারণ দুর্বল প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। যেখানে ইতিহাস প্রতিদিন নতুন করে জীবন্ত রাখা হয়, কারণ জীবন্ত ইতিহাস মানে জীবন্ত বিভাজন, আর জীবন্ত বিভাজন মানে জাতীয় মনোযোগ কখনো একজোট হয়ে কিছু দাবি করতে পারে না।

কেউ একটা ঘরে বসে এই পরিকল্পনা করেনি। এটা এমনভাবে গড়ে উঠেছে — প্রতিটা প্রজন্মের প্রতিটা সিদ্ধান্ত, প্রতিটা প্রতিক্রিয়া, একটার পর একটা জমে জমে — যে আজ এটা নিজে থেকেই চলে, নিজেকে নিজে টিকিয়ে রাখে, কোনো একক ব্যক্তির নির্দেশ ছাড়াই।

এবং এটাই সবচেয়ে রাগ করার মতো সত্য। কারণ একজন মানুষকে দোষ দেওয়া সহজ — তাকে সরিয়ে দিলে সমস্যা শেষ, এমন একটা বিশ্বাস নিয়ে বাঁচা যায়। কিন্তু একটা কাঠামোকে দোষ দেওয়া কঠিন, কারণ কাঠামো বদলাতে হলে আপনাকে বুঝতে হবে সেটা কীভাবে কাজ করে, আর তারপর সেটাকে ভিন্নভাবে তৈরি করতে হবে। এটা একটা মুখ সরানোর চেয়ে অনেক বেশি কঠিন কাজ।

তাহলে এই রাগটা কোথায় যাবে? যদি কোনো একজন মানুষ, কোনো একটা পরিবার, চুরির আসল হকদার না হয়, তাহলে আমরা কী করব এই ক্রোধ নিয়ে, যা এখন আপনার ভেতরে জমে আছে?

এই প্রশ্নের উত্তরেই এই বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় — যেখান থেকে ভাঙার ইচ্ছা বদলে যাবে গড়ার ইচ্ছায়। কিন্তু সাবধান থাকতে হবে এখানে, কারণ এই মোড়েই সবচেয়ে বেশি মানুষ ভুল পথে চলে যায়।

পরের অধ্যায়ে, আমরা দেখব কেন সেই ভুল পথটা — বিপ্লব, ভেঙে ফেলা, নতুন করে শুরু — এতটা লোভনীয় হওয়ার পরেও, একই ফল ফিরিয়ে দেয়।

Movement ৪ — The Break / Pivot

চতুর্থ অধ্যায়: মুক্তি

১১. কেন বিপ্লব একই জিনিস ফিরিয়ে দেয়

এই মুহূর্তে, আপনার ভেতরে যে রাগটা জমে আছে, তার একটা স্বাভাবিক ইচ্ছা থাকে — সব ভেঙে ফেলা। পুরো কাঠামো উপড়ে ফেলা। নতুন করে শুরু করা। এই দেশ এই ইচ্ছাটা অনেকবার অনুভব করেছে — এবং কয়েকবার সেই ইচ্ছাটা কাজেও রূপ নিয়েছে। রাস্তায় মানুষ নেমেছে, একটা সরকার পড়ে গেছে, নতুন মুখ ক্ষমতায় এসেছে, উৎসবের মতো আনন্দ হয়েছে — এই তো, এবার বদলাবে।

তারপর কী হয়েছে? কয়েক বছরের মধ্যে, একই ধরনের অভিযোগ, একই ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, একই ধরনের প্রতিষ্ঠান দুর্বল করে রাখার প্রবণতা — নতুন মুখে, পুরনো নাটক।

কেন এটা ঘটে বারবার? কারণ বিপ্লব একটা প্রশ্নের উত্তর দেয়, কিন্তু ভুল প্রশ্নের। বিপ্লব উত্তর দেয় "ক্ষমতায় কে থাকবে?" কিন্তু আসল প্রশ্নটা ছিল — "ক্ষমতাকে কোন আকার নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে?" যদি আকারটা একই থাকে — দুর্বল প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি-কেন্দ্রিক কর্তৃত্ব, জবাবদিহিতার অভাব — তাহলে সেই আকারে যে কেউ বসুক, ফলাফল একই হতে বাধ্য। এটা কোনো নৈতিক দুর্বলতার প্রশ্ন নয়। এটা একটা কাঠামোগত বাস্তবতা — যেমন একটা ভাঙা সেতুতে যে-কেউ গাড়ি চালাক, সেতুটা একই কারণে ভাঙবে।

এটা বোঝা অপমানজনক না, বরং মুক্তিদায়ক। কারণ এর মানে হলো — সমস্যাটা কোনো নির্দিষ্ট মানুষের চরিত্রে নেই। সমস্যাটা নকশায়। আর নকশা বদলানো সম্ভব — নাম বদলানোর চেয়ে ধীর, কিন্তু নাম বদলানোর চেয়ে স্থায়ী।

এখানেই এই বইয়ের কেন্দ্রীয় দাবি দাঁড় করানো যায়: আমাদের বিপ্লব দরকার নেই। আমাদের নকশা দরকার। আর বিবর্তন — ধ্বংস নয়, ধীর, ইচ্ছাকৃত, প্রজন্মব্যাপী নির্মাণ — সেই নকশার একমাত্র পথ, যা প্রতিবার একই ফাঁদে পড়ার চক্রটা ভাঙতে পারে।

১২. নকশা মানে কী

"নকশা" শব্দটা শুনতে বিমূর্ত লাগতে পারে, তাই এটা স্পষ্ট করা যাক একটা সহজ উপমা দিয়ে।

একটা সেতু তৈরি করার সময়, একজন ইঞ্জিনিয়ার আশা করে না যে যারা সেতুর উপর দিয়ে হাঁটবে তারা সবাই ভালো মানুষ হবে, সাবধানে হাঁটবে, নিয়ম মানবে। ইঞ্জিনিয়ার এমনভাবে সেতুটা ডিজাইন করে যে, যে কেউ হাঁটুক — সাবধানী বা অসাবধানী, ভালো বা খারাপ — সেতুটা ভার বহন করবে। ভালো নকশা মানুষের চরিত্রের উপর নির্ভর করে না। ভালো নকশা এমনভাবে তৈরি হয় যাতে খারাপ আচরণেরও একটা সীমা থাকে, আর সেই সীমা অতিক্রম করা কাঠামোগতভাবে কঠিন হয়ে যায়।

একটা রাষ্ট্রও তেমনই। একটা ভালো ডিজাইন করা রাষ্ট্র আশা করে না যার হাতে ক্ষমতা যাবে সে ফেরেশতা হবে। এটা এমনভাবে তৈরি হয় যে, ক্ষমতা যার হাতেই যাক, তার উপর একাধিক স্বাধীন চোখ থাকে, তার সিদ্ধান্ত জবাবদিহিতার মুখে পড়ে, তার কর্তৃত্বের একটা সীমা থাকে যা সে নিজে বদলাতে পারে না। এটাই নকশা — মানুষের ভালোত্বের উপর বাজি না রেখে, কাঠামোর মধ্যেই জবাবদিহিতা বসিয়ে দেওয়া।

আমাদের দেশে যা বারবার ঘটেছে, তা হলো — আমরা মানুষ বদলিয়েছি, নকশা বদলাইনি। আমরা আশা করেছি এই নতুন মানুষটা আগেরজনের চেয়ে ভালো হবে। কখনো কখনো হয়তো হয়েছেও। কিন্তু নকশাটা একই থাকায়, সময়ের সাথে সাথে সেই "ভালো মানুষ"ও একই কাঠামোর চাপে একই রকম আচরণ করতে বাধ্য হয়েছে, বা তার জায়গায় এমন কেউ এসেছে যে কাঠামোর সুযোগ পূর্ণভাবে নিয়েছে।

নকশা বদলানো মানে কী, বাস্তবে? এটা মানে এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যাদের স্বাধীনতা সংবিধানে সুরক্ষিত, ব্যক্তির ইচ্ছায় না। এটা মানে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে ক্ষমতার প্রতিটা পরিবর্তন — একজন থেকে আরেকজনের হাতে — একটা স্বয়ংক্রিয় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়, যা যাচাই করে এই পরিবর্তন কাঠামোগতভাবে ন্যায্য কি না। এটা মানে ক্ষমতাকে এমনভাবে ভাগ করা যে কোনো একটা একক জায়গায় তার পুরোটা জমা না হয়।

এসব কোনো নতুন আবিষ্কার নয় — পৃথিবীর যে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীল শাসন গড়ে তুলেছে, তারা কোনো না কোনো ভাবে এই নীতিগুলোই অনুসরণ করেছে। প্রশ্নটা হলো — আমরা কি এই নকশাটা নিজেদের জন্য, নিজেদের বাস্তবতা অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করব? নাকি আমরা আরও পঞ্চাশ বছর অপেক্ষা করব, আশা করে যে এইবার মানুষটা ভালো হবে?

১৩. তুমি কী নিয়ে ঝগড়া করবে, তা তোমার পছন্দ

এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, সরাসরি আপনাকে।

আপনি মনে করতে পারেন নকশা বদলানো রাষ্ট্রের কাজ, সংবিধানের কাজ, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাজ — আপনার হাতে কিছু নেই। এটা আংশিক সত্য। বড় কাঠামোগত পরিবর্তন সময় নেয়, আর তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন, যা এই বইয়ের পরের ভাগে আমরা বিস্তারিত দেখব।

কিন্তু একটা জিনিস সম্পূর্ণভাবে আপনার হাতে আছে, আজই, এই মুহূর্তে — আপনি কী নিয়ে ঝগড়া করবেন, তা আপনার পছন্দ।

প্রতিদিন আপনার সামনে দুটো তর্কের সুযোগ আসে। একটা হলো পুরনো তর্ক — কে সঠিক ছিল, কে ভুল ছিল, কে দায়ী। এই তর্কে জেতা যায়, কিন্তু জেতার পরেও কিছু তৈরি হয় না, কারণ এই তর্কের ফলাফল আগেই ঠিক করা — যে যেদিকে ছিল, সে সেদিকেই থাকে, শুধু আরেকটু ক্ষুব্ধ হয়ে।

আরেকটা তর্ক আছে, যা আমরা প্রায় করি না, কিন্তু করতে পারি — "আমাদের এলাকার স্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষার মান কেমন হওয়া উচিত?" "আমাদের শহরে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য কী বাধা আছে, আর সেগুলো কীভাবে সরানো যায়?" "আমাদের তরুণদের গবেষণার জন্য কোন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব, স্থানীয়ভাবে, এখনই?" এই তর্কগুলোর ফলাফল আগে থেকে ঠিক করা নয় — এগুলো থেকে সত্যিকারের কিছু তৈরি হতে পারে, কারণ এগুলো ভবিষ্যতমুখী, অতীতমুখী নয়।

এটা শুনতে ছোট লাগতে পারে, প্রায় তুচ্ছ, একটা জাতির পঞ্চাশ বছরের সমস্যার তুলনায়। কিন্তু ভাবুন — যদি লক্ষ লক্ষ মানুষ, একই সময়ে, তাদের দৈনিক তর্কের বিষয় বদলে ফেলে অতীত থেকে ভবিষ্যতে, তাহলে সেটা কোনো ছোট ঘটনা নয়। সেটা একটা জাতীয় মনোযোগের পুনর্বণ্টন — সেই মনোযোগ, যা এতদিন চুরি হয়ে যাচ্ছিল, তা এখন ফিরে আসছে তার আসল মালিকের হাতে, আর সেই মালিক ঠিক করছে এটা কোথায় খরচ হবে।

এটাই বিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ। এটা কোনো নেতার ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না। এটা শুরু হয় লক্ষ লক্ষ ছোট সিদ্ধান্ত দিয়ে — কী নিয়ে কথা বলব আজ, কোন প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করব, কোন তর্কে সময় দেব।

আপনার রাগ এখন একটা দিক পেয়েছে। পুরনো লড়াইয়ের বদলে, এখন সেই শক্তিটা একটা প্রশ্নের দিকে ঘুরে গেছে — আমরা কী হতে পারি? সেই প্রশ্নের উত্তরই এই বইয়ের পরের অংশ। এখন আমরা স্বপ্ন দেখতে যাচ্ছি — কিন্তু এই স্বপ্নটা এখন আর পলায়ন নয়। এটা একটা নকশা, যা আমরা একসাথে তৈরি করতে যাচ্ছি।

Movement ৫ — Ambition

পঞ্চম অধ্যায়: স্বপ্ন — ২০৭৫

১৪. যে সকালে খবরে থাকে একটা ল্যাবের নাম

(বিজ্ঞান)

চট্টগ্রামের একটা গবেষণা কেন্দ্র। ভোর ছয়টা। একজন তরুণী, বয়স আঠাশ, ল্যাবের দরজা খুলছেন নিজের কার্ড দিয়ে। তার পেছনে একটা বোর্ডে লেখা আছে গত রাতের একটা তথ্য — একটা প্রোটিন গঠনের নতুন মডেল, যা গত সপ্তাহে আপলোড হয়েছে একটা আন্তর্জাতিক জার্নালে। আজ সকালে তার ফোনে বার্তা — জেনেভার একটা গবেষণা দল তাদের মডেলটা ব্যবহার করে নিজেদের কাজ এগিয়ে নিয়েছে, আর তারা ধন্যবাদ জানাতে লিখেছে।

তিনি হাসেন। এটা তার জন্য নতুন কিছু নয় — এই বছর তৃতীয়বার এমন বার্তা এলো। কিন্তু তিনি এখনও মনে রাখেন সেই দিনটা, দশ বছর আগে, যখন এই ল্যাবটা ছিল একটা ফাঁকা মাঠ, আর একটা প্রশ্ন ছিল — "আমরা কি সত্যিই এটা তৈরি করতে পারব, না এটাও আরেকটা অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি?"

তার সহকর্মীরা আসছেন একে একে। কেউ ঢাকা থেকে, কেউ সিলেট থেকে, কেউ বিদেশ থেকে ফিরে এসেছেন — কারণ এখন এখানেই সেরা কাজ হয়। এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন, যা সংখ্যায় মাপা যায় না: দশ বছর আগে যে মেধা দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবত, আজ সে দেশে ফেরার কথা ভাবে।

এই ল্যাবটা কোনো অলৌকিক ঘটনায় তৈরি হয়নি। এটা তৈরি হয়েছে একটা সিদ্ধান্তে — যে গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ করতে হবে, রাজনৈতিক চক্রের হিসাবে না, প্রজন্মের হিসাবে। এটা তৈরি হয়েছে একটা কাঠামোতে, যেখানে অর্থ বরাদ্দ কারো পরিচয়ের ভিত্তিতে হয় না, কাজের গুণমানের ভিত্তিতে হয়। এটা তৈরি হয়েছে হাজার হাজার ছোট সিদ্ধান্তে, যেগুলো একসময় অসম্ভব মনে হতো।

এটাই ২০৭৫। এটা কল্পবিজ্ঞান নয়। এটা একটা হিসাব — যদি আমরা আজ থেকে মনোযোগ দিই।

১৫. যে ঢাকায় জন্ম আপনার সীমা ঠিক করে না

(একটা চিঠি, লেখা ভবিষ্যতের একটা মেয়ের কাছ থেকে, তার দাদির কাছে)

প্রিয় দাদি,

তুমি প্রায়ই বলতে, তোমার সময়ে একটা মেয়ের ভবিষ্যৎ অনেকটাই ঠিক হয়ে যেত তার বাবা কী করে, তার পরিবার কোন এলাকায় থাকে, তার স্কুলটা কেমন — এসব দিয়ে। তুমি বলতে, মেধা থাকলেও সুযোগ না থাকলে কিছু হয় না।

আজ আমার স্কুলের কথা বলি। আমার ক্লাসে চল্লিশ জন ছাত্রছাত্রী — কেউ এসেছে বস্তি এলাকা থেকে, কেউ এসেছে বড় বাড়ি থেকে। কিন্তু আমাদের সবার হাতে একই মানের শিক্ষক, একই মানের ল্যাব, একই সুযোগ প্রতিযোগিতায় নামার। এই বছর আমাদের স্কুল থেকে যে তিনজন জাতীয় বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় গেছে, তাদের একজনের বাবা রিকশা চালান। এটা এখন এত স্বাভাবিক যে আমরা এটা নিয়ে আলাদা করে কথাও বলি না।

তুমি জানতে চাইতে — এটা কীভাবে সম্ভব হলো? আমি স্কুলে শিখেছি, এটা কোনো একজন মানুষ বা একটা প্রকল্পের কারণে হয়নি। এটা হয়েছে কারণ কেউ একসময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে শিক্ষার মান একটা জাতীয় প্রতিশ্রুতি হবে, ব্যক্তিগত ভাগ্যের বিষয় হবে না। প্রতিটা এলাকায় সমান বরাদ্দ, প্রতিটা শিক্ষকের জন্য সমান প্রশিক্ষণ, আর একটা ব্যবস্থা যা যাচাই করে এই সমতা আসলেই বজায় থাকছে কি না।

দাদি, তুমি একবার আমাকে বলেছিলে, তোমার প্রজন্ম "ভাগ্য" নিয়ে অনেক কথা বলত — কার ভাগ্য ভালো, কার খারাপ। আমার প্রজন্ম এই শব্দটা কম ব্যবহার করে। আমরা বলি "নকশা" — কে কী সুযোগ পেয়েছে, তার পেছনে একটা কারণ আছে, আর সেই কারণটা যদি অন্যায্য হয়, তাহলে সেটা বদলানো সম্ভব।

তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, দাদি, তোমার প্রজন্মের রাগ আর ধৈর্যের জন্য, যা এই বদলটা শুরু করেছিল।

তোমার নাতনি

১৬. যা আমরা বিক্রি করি না, তৈরি করি

(একটা সাক্ষাৎকারের অংশ — একজন উদ্যোক্তার কথা)

"আমরা এখন যা রপ্তানি করি, তার নাম আপনি হয়তো জানেন না — কারণ এটা কোনো পোশাক নয়, কোনো কাঁচামাল নয়। এটা একটা সফটওয়্যার, যা এখন বিশ্বের চারটা মহাদেশের হাসপাতালে ব্যবহার হয় রোগ নির্ণয়ের জন্য। আমরা এটা তৈরি করেছি এখানে, ঢাকায়, একটা এমন টিম দিয়ে যাদের অর্ধেকের বেশি কখনো দেশের বাইরে পড়াশোনা করেনি।

দশ বছর আগে, যখন আমরা শুরু করি, সবাই বলত — এই দেশে এই কাজ হয় না, বিদেশে যাও, বিদেশি বিনিয়োগ খোঁজো, বিদেশি সার্টিফিকেট নাও। আমরা সেটা করিনি। আমরা বলেছিলাম — যদি আমাদের মেধা এখানে থেকেও বিশ্বমানের কিছু তৈরি করতে না পারে, তাহলে সমস্যাটা মেধায় নয়, ব্যবস্থায়।

আর সত্যিই তাই ছিল। যখন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির সুরক্ষা মজবুত হলো, যখন ছোট কোম্পানির জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমলো, যখন বিনিয়োগ আসার পথ পরিচয় বা সম্পর্কের ওপর না, প্রকল্পের গুণমানের ওপর নির্ভর করল — তখন আমাদের মতো শত শত কোম্পানি জন্ম নিলো। আমরা একা নই। আমরা একটা ঢেউয়ের অংশ।

আমাদের অর্থনীতি এখন আর শুধু কম দামে শ্রম বিক্রি করে না। আমরা এখন এমন জিনিস তৈরি করি যা বিশ্বের অন্য কেউ ঠিক আমাদের মতো তৈরি করতে পারে না — কারণ আমরা সেই সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করি, যা আমাদের নিজের বাস্তবতা থেকে এসেছে, আর সেই বাস্তবতা এখন বিশ্বের অনেক দেশের বাস্তবতা।"

১৭. যেখানে ক্ষমতা বদলায়, ভয় ছাড়াই

(একটা সংবাদ প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্ত অংশ, ২০৭৫)

গতকাল সন্ধ্যায়, দেশের নির্বাচন কমিশন ফলাফল ঘোষণা করেছে — বিরোধী দল সরকার গঠন করবে, বর্তমান সরকারের আসন সংখ্যা কমেছে। ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী একটা সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিয়েছেন, ফলাফল মেনে নিয়ে, আর আগামী সপ্তাহে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরুর তারিখ জানিয়েছেন।

রাস্তায় কোনো উদযাপনের বিস্ফোরণ নেই, কোনো আতঙ্কও নেই। মানুষ কাজে যাচ্ছে, যেমন সাধারণত যায়। একটা চা দোকানের মালিক বলছেন, "আমরা জানি যে জিতেছে সে ভালো কাজ করবে, আর যদি না করে, পাঁচ বছর পর আমরা আবার সিদ্ধান্ত নেব। এটা এত জটিল কিছু না।"

এই নির্বিকারতা নিজেই একটা অর্জন। পঞ্চাশ বছর আগে, ক্ষমতার প্রতিটা হস্তান্তর ছিল একটা সংকট — প্রশ্ন উঠত নির্বাচন আসলেই স্বাধীন ছিল কি না, ফলাফল মেনে নেওয়া হবে কি না, রাস্তায় সহিংসতা হবে কি না। আজ, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা সংবিধানে এমনভাবে সুরক্ষিত যে তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নের বিষয়ই নয় — এটা একটা ধরে নেওয়া সত্য, যেমন ধরে নেওয়া হয় সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে।

এটাই বদলের সবচেয়ে গভীর প্রমাণ — যখন কিছু আর "খবর" থাকে না, কারণ এটা এত স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

১৮. যে বাংলাদেশকে বিশ্ব উপেক্ষা করতে পারে না

(একটা সংক্ষিপ্ত দৃশ্য — একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কক্ষে)

জেনেভায় একটা আন্তর্জাতিক নীতি সম্মেলনে, একটা প্যানেল আলোচনা চলছে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে। মডারেটর প্রশ্ন করছেন কোন দেশের মডেলটা সবচেয়ে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে বিশ্বের অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। উত্তর — বাংলাদেশের একটা মডেল, যা মূলত তৈরি হয়েছিল দেশের নিজের বন্যা-প্রবণ এলাকার জন্য, আর এখন ব্যবহার হচ্ছে ভিয়েতনাম, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইনে।

কক্ষে বাংলাদেশের প্রতিনিধি বসে আছেন — তাকে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, কারণ ঘরে থাকা অনেকেই তার আগের কাজ জানেন, পড়েছেন, উদ্ধৃত করেছেন। এটা এমন একটা মুহূর্ত, যা পঞ্চাশ বছর আগে কল্পনা করা কঠিন হতো — বাংলাদেশ টেবিলে বসে আছে সাহায্য চাইতে নয়, একটা সমাধান নিয়ে, যা বিশ্ব শিখতে চায়।

এটাই সবচেয়ে গভীর পরিবর্তন — প্রতিবেশীর উঠান থেকে নিজের ঘর হয়ে ওঠা। এটা কোনো একদিনের বিজয় নয়। এটা পঞ্চাশ বছরের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের যোগফল — যেগুলোর প্রতিটা তখন ছোট মনে হয়েছিল।

এখন প্রশ্নটা আর "এটা সম্ভব কি না" নয়। প্রশ্নটা হলো — এই ২০৭৫-এ পৌঁছানোর পথে, আপনি সোমবার সকালে কী করবেন।

সেটাই এই বইয়ের শেষ অধ্যায়ের বিষয়।

Movement ৬ — Covenant / Activation

ষষ্ঠ অধ্যায়: অঙ্গীকার

১৯. ছোট থেকে শুরু

এখানে একটা ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন, কারণ এই ভুল ধারণাটাই বহু মানুষকে কিছু শুরু করার আগে থামিয়ে দেয়: বিবর্তন মানে ধীর, কিন্তু ধীর মানে ছোট নয়।

আমরা ভাবি, যদি বিপ্লব না হয়, তাহলে যা করার আছে তা বিশাল কিছু — সংসদে বসা, সংবিধান বদলানো, একটা দল গঠন করা। এসব প্রয়োজনীয়, কিন্তু এসব একদিনে সবার কাজ নয়। বিবর্তনের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে এমন জায়গায়, যা প্রায় কেউ লক্ষ্যই করে না — একটা এলাকার স্কুল কমিটির একটা সিদ্ধান্তে, একটা ছোট ব্যবসার স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণে, একটা প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা ভিত্তিক নিয়োগের একটা নিয়মে, একটা পরিবারে একটা মেয়েকে তার ভাইয়ের সমান সুযোগ দেওয়ার একটা সিদ্ধান্তে।

এগুলো শোনায় ছোট। কিন্তু এখানেই আসল রহস্য — একটা কাঠামো যেমন লক্ষ লক্ষ ছোট আচরণ জমে তৈরি হয়েছিল, একটা নতুন কাঠামোও তৈরি হবে লক্ষ লক্ষ ছোট আচরণ জমে। কোনো একটা আইন, কোনো একটা নেতা, একদিনে এই পরিবর্তন আনতে পারে না। কিন্তু যদি যথেষ্ট মানুষ, যথেষ্ট জায়গায়, একই দিকে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে — তাহলে সেই ছোট সিদ্ধান্তগুলো একসময় একটা নতুন স্বাভাবিকতা তৈরি করে। আর নতুন স্বাভাবিকতাই আসলে নতুন কাঠামো, শুধু আইনের বইয়ে লেখার আগেই বাস্তবে চলতে শুরু করে।

এর মানে এই নয় যে বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজন নেই — নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের কাঠামো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ — এসব বড় কাজ, আর এসব করতে হবে তাদের যাদের হাতে সেই ক্ষমতা আছে বা আসবে। কিন্তু এই বড় কাজগুলো একটা মাটির উপর দাঁড়াতে হয়, আর সেই মাটি তৈরি হয় লক্ষ লক্ষ মানুষের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে। একটা জাতি যদি প্রতিদিন অতীতের হিসাব করে, তাহলে সবচেয়ে ভালো সংবিধানও দুর্বল মাটিতে দাঁড়াবে। একটা জাতি যদি প্রতিদিন ভবিষ্যতের নকশা করে, তাহলে সেই মাটি নিজেই বড় সংস্কারগুলো দাবি করতে শুরু করবে, আর সেই দাবিটা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে যাবে।

তাই এই বইয়ের শেষ অধ্যায়ে আমরা বড় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না। আমরা ছোট, নির্দিষ্ট, করা-সম্ভব জিনিসের কথা বলছি।

২০. সোমবার সকালে তুমি যা করবে

এই বইটা শেষ করার পর আপনি বন্ধ করে রেখে দিতে পারেন, আর কাল সকালে সেই একই পুরনো তর্কে ফিরে যেতে পারেন। এটাই সবচেয়ে সহজ পথ, কারণ পুরনো অভ্যাস সবসময় নতুন সিদ্ধান্তের চেয়ে সহজ।

তাই এখানে পাঁচটা জিনিস, নির্দিষ্টভাবে, যা আপনি সোমবার সকাল থেকে করতে পারেন — কোনো সংগঠনের সদস্য না হয়েও, কোনো রাজনৈতিক পক্ষ না নিয়েও:

এক — একটা প্রশ্ন বদলান। যখন আপনি কোনো আলোচনায় ঢোকেন, পুরনো প্রশ্নের বদলে একটা নতুন প্রশ্ন আনুন। "কে দায়ী" এর বদলে জিজ্ঞেস করুন "এটা আবার হওয়া থেকে আটকানোর কাঠামোগত উপায় কী?" একটা প্রশ্ন বদলে গেলে, পুরো আলোচনার দিক বদলে যায়।

দুই — একটা প্রতিষ্ঠানকে যাচাই করুন যোগ্যতা দিয়ে, পরিচয় দিয়ে না। আপনার ব্যবসায়, আপনার পরিবারে, আপনার প্রভাবের যে কোনো ছোট জায়গায়, একটা সিদ্ধান্ত নিন যোগ্যতার ভিত্তিতে, সম্পর্কের ভিত্তিতে না। এটা ছোট শোনায়। কিন্তু এই একটা অভ্যাস, লক্ষ লক্ষ জায়গায় প্রতিদিন প্রয়োগ হলে, একটা জাতির মেধা বণ্টনের পুরো চিত্র বদলে দেয়।

তিন — একটা তরুণকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করুন, একটা উত্তর দেওয়ার বদলে। "তুমি কী হতে চাও" এর বদলে জিজ্ঞেস করুন "তুমি কী তৈরি করতে চাও।" এই একটা ছোট ভাষার বদল একটা প্রজন্মের চিন্তাভঙ্গি ধীরে ধীরে সরিয়ে দেয় পরিচয়ের চিন্তা থেকে নির্মাণের চিন্তায়।

চার — একটা দিন বেছে নিন, প্রতি সপ্তাহে, যখন আপনি অতীতের কোনো তর্কে অংশ নেবেন না। এটা কঠিন শোনাবে প্রথমে, কারণ অভ্যাসটা গভীর। কিন্তু একদিনও যদি আপনি এই অভ্যাস থেকে বের হতে পারেন, আপনি নিজের মধ্যে অনুভব করবেন কতটা মনোযোগ ফিরে আসে।

পাঁচ — একটা ছোট কিছু তৈরি করুন, বিক্রি করার জন্য না, প্রমাণ করার জন্য। একটা লেখা, একটা কোড, একটা ছোট গবেষণা, একটা স্থানীয় সমাধান — যা কিছু আপনার হাতে আছে তৈরি করার সামর্থ্য, তা তৈরি করুন, আর সেটা প্রকাশ করুন। এটা প্রমাণ করে নিজেকে, আর আপনার চারপাশের মানুষকে, যে নির্মাণ সম্ভব এখানে, এখনই, অতীতের অপেক্ষা না করে।

এই পাঁচটা জিনিস কোনো একটা সরকার বদলাবে না, একটা মাসে। কিন্তু যদি এই বইয়ের প্রতিটা পাঠক এর মধ্যে একটাও শুরু করেন, আর সেটা তাদের চারপাশের মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেন — তাহলে এটা সেই লক্ষ লক্ষ ছোট সিদ্ধান্তের শুরু, যা এই বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে বলা নকশার ভিত্তি তৈরি করে।

২১. একটা সকাল, আবার

কল্পনা করুন সেই সকালটা আবার।

চা এখনও গরম, ফোনটা হাতে। আপনি খবরের অ্যাপটা খুলছেন। আর আজ, বাস্তবতা হলো — সেখানে এখনও পুরনো লড়াইয়ের একটা নতুন সংস্করণ থাকবে। কারো একটা বিবৃতি, কারো একটা অভিযোগ, একটা পুরনো ক্ষতের নতুন খোঁচা। ২০৭৫ এখনো আসেনি, আর এই বইটা বন্ধ করার সাথে সাথে বাস্তবতা বদলে যাবে না।

কিন্তু একটা জিনিস বদলে গেছে, যদি এই বইটা তার কাজ করে থাকে। এখন আপনি জানেন এটা কী — এটা একটা কাঠামো, ইচ্ছাকৃত নয় কিন্তু কার্যকর, যা আপনার মনোযোগ চুরি করার জন্য তৈরি। এখন আপনার হাতে একটা পছন্দ আছে, যা আগে ছিল না, কারণ আগে আপনি জানতেন না এটা একটা পছন্দ।

আপনি সেই খবরটা পড়তে পারেন, রাগ করতে পারেন, একটা মন্তব্য লিখতে পারেন, আর তারপর সেই দশ মিনিটটা হারিয়ে ফেলতে পারেন, যেমন পঞ্চাশ বছর ধরে হারিয়েছেন। অথবা আপনি ফোনটা রাখতে পারেন, আর জিজ্ঞেস করতে পারেন নিজেকে — আজ আমি কী তৈরি করব?

এই প্রশ্নটাই এই বইয়ের বীজ। এটা কোনো বিপ্লবের ঘোষণা নয়। এটা একটা ছোট, দৈনিক, প্রায় অদৃশ্য সিদ্ধান্ত — কিন্তু এই সিদ্ধান্তই, লক্ষ লক্ষ মানুষের হাতে, লক্ষ লক্ষ সকালে নেওয়া হলে, একটা জাতির মনোযোগের পুরো দিক ঘুরিয়ে দিতে পারে।

আমি জানি না এই বইটা কতজনের হাতে পৌঁছাবে, বা কতজন এই বীজটা তাদের নিজের মাটিতে বপন করবেন। কিন্তু আমি জানি এটা — একটা প্রশ্ন হাটাজারির একটা ছেলের মনে জন্ম নিয়েছিল, ২০০৬ সালের একটা নির্বাচন যা কখনো হয়নি তা দেখে, আর সেই প্রশ্নটা আজ পর্যন্ত থামেনি। যদি সেই একটা প্রশ্ন এতদূর নিয়ে আসতে পারে, তাহলে আপনার প্রশ্নটাও পারবে।

২০৭৫ কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়। এটা একটা আমন্ত্রণ।

আসুন, একসাথে নকশা করি।